শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ৭ বছর

ডেস্ক নিউজঃ নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ৭ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল র‌্যাবের হাতে এই ৭টি খুন সংঘটিত হয়েছিলো। যে ঘটনা স্মরণে আজো শিউরে ওঠে মানুষ।

সেদিন নারায়ণগঞ্জ আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকা থেকে ২৭ এপ্রিল বেলা দেড়টার দিকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জন। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে ছয়টি লাশ, পরদিন মেলে আরেকটি লাশ। নিহত বাকিরা হলেন নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম।

ঘটনার এক দিন পর কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা (পরে বহিষ্কৃত) নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় ১১ মে একই থানায় আরেকটি মামলা হয়। এই মামলার বাদী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। পরে দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্ত করে পুলিশ।

সাত খুনের মামলায় মোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তারা হলেন চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা, হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দ বালা, করপোরাল রুহুল আমিন, এএসআই বজলুর রহমান, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নুরুজ্জামান, কনস্টেবল বাবুল হাসান, সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, করপোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর, এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান, সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, তার সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান (চার্চিল) নূর হোসেনের আরেক সহযোগী সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, ম্যানেজার শাহজাহান ও ম্যানেজার জামাল উদ্দিন।

পরবর্তীতে জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন এই চাঞ্চল্যকর মামলার আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যবেক্ষণ করে ৩৩ মাস পর এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করেন। রায়ে ২৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড এবং আলামত ধ্বংস করার দায়ে আরো ৭ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। রায় পেয়ে বাদিপক্ষ ও হতাহতের পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেন।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন: নাসিকের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাব-১১’র সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মুহাম্মদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব.) মাসুদ রানা, হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্সনায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্সনায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়্যব, কনস্টেবল শিহাব উদ্দিন, র‌্যাবের সদস্য এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সিপাহী সাদুজ্জামান নূর, নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী, আবুল বাশার, নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান, জামাল উদ্দিন, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, সৈনিক আলামিন শরীফ, সৈনিক তাজুল ইসলাম ও সার্জেন্ট এনামুল কবির।

এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্তরা হলেন: ল্যান্স কর্পোরাল রুহুল আমিন (১০ বছর), এএসআই বজলুর রহমান (৭ বছর), হাবিলদার নাসির উদ্দিন (৭ বছর), এএসআই আবুল কালাম আজাদ (১০ বছর), সিপাহী নুরুজ্জামান (১০ বছর), বাবুল হাসান (১০ বছর), র‌্যাবের সদস্য কর্পোরাল মোখলছুর রহমান (১০ বছর) এএসআই কামাল হোসেন (১০ বছর) ও কনস্টেবল হাবিবুর রহমান (১৭ বছর)।

এর পর মামলাটি উচ্চ আদালতে গেলে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এতে ২৬ জনের মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রেখে অন্য আসামিদের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা বহাল রাখা হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- নূর হোসেন, তারেক সাঈদ ও আরিফ হোসেন বাদে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর আসামিরা হলেন লে. কমান্ডার (চাকরিচ্যুত) এম মাসুদ রানা, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, এ বি মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব আলী, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলিম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম।

আসামিরা পুনরায় আপিল করার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি চলছে। নিহতদের পরিবারের দাবি, উচ্চ আদালত চূড়ান্ত রায়ে যেন সঠিক বিচার বিবেচনা করেন। সাত খুনের আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হলে অপরাধীদের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। এতে করে অপরাধ হত্যার প্রবণতা কমে আসবে।

এদিকে হতাহতের শিকার পরিবারগুলোর মধ্যে আইনজীবী চন্দন সরকারের ড্রাইভার জাহাঙ্গীর, ইব্রাহিম ও নজরুল ইসলামের সহযোগী তাজুল ইসলামের পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। তারা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। এইসব পরিবারের দাবি, সরকার যেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ায়।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Recent Comments

    © All rights reserved © 2023
    Design & Developed BY M Host BD