শামীম-আইভীর বিরোধ মিটাবে কে?

74

আবদুর রহিমঃ শামীম-আইভীর বিরোধ মিটাবে কে? এমন প্রশ্ন নারায়নগঞ্জের সবর্ত্র। পূর্ব পুরুষদের এই বিরোধ এসে ঠেকেছে শামীম-আইভীতে। ২০০৩ সালের পৌরসভার নির্বাচনের আগে থাকে আইভীর সাথে শামীম ওসমানের সু সম্পর্ক থাকলেও পৌর মেয়র হওয়ার পর তাঁদের সম্পর্কে চির ধরে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিরোধ। কয়েক দশক পর চাঙা হয়ে ওঠে উত্তর-দক্ষিন মেরুর রাজনীতি। বর্তমানে এই বিরোধ চরম প্রর্যায়ে চলে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, স্বাধীনতার পরবর্তীকালে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই মেরুর রাজনীতি প্রায় পাঁচ দশক ধরে। ওসমান পরিবার ও চুনকা পরিবারের দ্বন্ধ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে। তবে দু’টি পরিবারই আওয়ামী লীগের রাজনীতির পরীক্ষিত পক্ষ।

১৯৭২ সালে শহর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের সময় ওসমান ও চুনকা পরিবারের বিরোধ আর চাপা থাকেনি। ১৯৭৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচন নিয়ে আবার দ্বন্দ্ব দেখা দেয় দুই পরিবারে। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো পরোক্ষে এই দ্বন্ধ-বিরোধ আজো রয়ে গেছে।

জানা গেছে, খান সাহেব ওসমান আলীর পরিবার আর আলী আহমেদ চুনকার পরিবার প্রথম মুখোমুখি হয় ১৯৭৩ সালে। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় দলীয় প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের মধ্যে দ্বন্ধের সূত্রপাত।
১৯৭৩ সালে পৌরসভা নির্বাচনে আলী আহমেদ চুনকা আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত করেন ওসমান পরিবারের সমর্থিত প্রার্থী খোকা মহিউদ্দিনকে।এই দ্বন্দ্ব আরো জোরালো হয় ১৯৮০ সালে। এবার বিরোধের বিষয় জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। প্রতিযোগী সেই শামসুজ্জোহা ও আলী আহমদ চুনকা। এবার সরাসরি শামসুজ্জোহাকে হারিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন চুনকা।

মাঝে কয়েক বছর বিরতি দিয়ে দুই পরিবারের বিরোধ সামনে আসে নারায়ণগঞ্জ নগর পিতার আসনটি নিয়ে। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন চেয়েছিলেন চুনকা কন্যা আইভী। কিন্তু সেই সমর্থন পেয়েছিলেন শামসুজ্জোহার ছেলে শামীম ওসমান। ফল সেই আগের মতোই। আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটে হারিয়ে মেয়র হন আইভী।

নানা ঘটনা আর শামীম-আইভীর বাকযুদ্ধ উত্তপ্ত রাখে জেলা রাজনীতিকে। আইভী দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র হওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যত বাধা ছিল না ওসমান পরিবার। কিন্তু জেলার লোকজন বলছেন, আদৌতে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে লড়েই দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র হন আইভী। রাজনৈতিক বিরোধ, বাগবিতন্ডা, আলোচনা এবং শেষে হকার ইস্যু সংঘাতে রূপ নেয়।

জানা যায়, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের মেধাবী শিক্ষার্থী আইভীর নির্বাচন কমিটির সদস্যসচিব রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ঘটনায় ওসমান পরিবারকে দায়ী করেন রাব্বি। ওই সময় আইভী ত্বকী হত্যার জন্য সরাসরি ওসমান পরিবারের সদস্যদের দায়ী করে বিচার দাবি করেন প্রকাশ্যে।

এ ছাড়া শামীম ওসমানের অনুগতরা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালালে সেখানে বাধ সাধেন আইভী। সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কাজের টেন্ডার আহ্বান থাকে উন্মুক্ত। এসব কারণেই মূলত তাদের মধ্যে বিরোধ দিনের পর দিন বাড়তে থাকে। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালের রাতে একাত্তর টিভির একটি টকশোতে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন শামীম-আইভী। পরে ওই টকশো তাৎক্ষণিক বন্ধ করে দেয়া হয়। শামীম-আইভী বিরোধের ঘটনা নিয়ে দেশ-বিদেশে তোলপাড় হয়।

২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ নগরীর ফুটপাথ থেকে উচ্ছেদকৃত হকারদের পুনরায় বসানোকে কেন্দ্র করে সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থক ও সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভীর সমর্থক ও নগরবাসীর মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া ও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে হকার ও শামীর ওসমান সমর্থকদের হামলার মুখে পড়েন মেয়র আইভী। পরে আইভীর সমর্থকরা তাকে ঘিরে রাখেন। এ সময় ঢিলের আঘাতে মেয়র আইভী আহত হন।

নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাংসদ শামী ওসমান ও মেয়র আইভীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টিতে তৃতীয় পক্ষ কাজ করে থাকেন। ওই পক্ষটি শামীম-আভীর ঐক্য চাচ্ছে না। ফলে দিনে দিনে তাঁদের বিরোধ বেড়েই চলেছে। তবে এই বিরোধ কবে মিটবে, কে মিটাবে? এই প্রশ্ন এখন নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

নিউজটি শেয়ার করুন...