মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন

ভয়ংকর খুনি

অনলাইন ডেস্কঃ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আল নুর মসজিদে হামলার সময় সেখানকার ছোট অজুখানায় ছিলেন আনোয়ার আল সালেহ। হাত ধোয়ার সময় হঠাৎ করেই গুলির আওয়াজ শোনেন তিনি। বাইরে প্রচণ্ড চিৎকার। আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে মানুষ। এর মধ্যে শুনতে পান হামলাকারী আক্রোশে বলছে, ‘আজ তোদের সবাইকে খুন করব।’

ক্রাইস্টচার্চের স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য প্রেস ও নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ভয়ংকর দুপুরটির চিত্র।

১৯৯৬ সালে ফিলিস্তিন থেকে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে এসে বাস করতে শুরু করেন আনোয়ার। শান্ত ছবির মতো এই শহরটিতে কখনো কোনো গন্ডগোলের খবর পাননি তিনি। শান্তিতেই বাস করছিলেন। তবে আজ দুপুরে হঠাৎ গুলির শব্দ যেন তার জগৎকে লন্ডভন্ড করে দেয়। নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানায় এখান থেকে বের হওয়া যাবে না। অজুর ঘরে বসেই জরুরি সেবায় ফোন করেন তিনি। কয়েকবার পুলিশকে ফোন দেন। তবে কাউকেই ফোনে পাননি। শেষে অ্যাম্বুলেন্স–সেবায় ফোন দিয়ে বিপদের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘এখানে ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড চলছে। দয়া করে সাহায্য করুন। পুলিশ পাঠান, তারা গুলি করেই যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বন্দুকধারী বলছে, মুসলমান তোদের আজ আমরা খুনই করে ফেলব।’

আনোয়ার জানান, গুলি খেয়ে আহত মানুষগুলো বন্দুকধারীর কাছেই বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। তবে তাঁদের আবারও গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে বন্দুকধারী। তিনি বলেন, ঘটনার ২০ মিনিট পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। মাথার পেছনে হাত বেঁধে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। দেখতে পান অসংখ্য নারী-পুরুষের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘এদের সন্ত্রাসী বললে কম বলা হয়, এরা ঠান্ডা মাথার ভয়ংকর খুনি।’

Eprothom Aloনাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি জানান, সাত বছর আগে জর্ডান থেকে এখানে আসেন তিনি। শান্তিতে পরিবার নিয়ে বাস করার লক্ষ্যেই এখানে আসা। গোলাগুলির শব্দ শুনে প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, কোথাও বাজি ফুটছে। কারণ শান্ত এই শহরে কখনো এমন হয়নি। ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে পাঁচিল টপকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছান তিনি। দেখেন পান, সবাই প্রাণভয়ে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। পড়ে আছে নিথর দেহ।

তিনি জানান, নিহত কয়েকজনকে তিনি খুব ভালো করে চেনেন। তাঁদের একজন সিরিয়ান শরণার্থী আছেন, যিনি ছয় মাস আগে পরিবার নিয়ে এখানে এসেছেন। স্ত্রী আর তিনটে ফুটফুটে সন্তান আছে ওই সিরীয় ব্যক্তির। একজন ক্যান্টারবেরি মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের মহাপরিচালক আছেন। জর্ডান থেকে আসা ওই ব্যক্তি সব সময় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন, সৎ পরামর্শ দিতেন। সাত বছর বয়সী একটা ছেলে আছে তাঁর।

ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সবার জন্যই বেদনাদায়ক দিন। মানুষ মেঝেতে আহত হয়ে পড়ে আছেন। চারদিকে রক্ত। চিৎকার করে কাঁদছেন সাহায্যের আশায়। কিন্তু পুলিশ আমাদের ওখানে যেতে দিচ্ছে না। জায়গাটা এখনো নিরাপদ নয়। আমরা আমাদের ভাইদের জন্য কিছুই করতে পারিনি।’

১৪ বছরের এক কিশোর জানায়, তার চাচাকে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করে বন্দুকধারী। সে বলে, ‘আমরা মাত্র নামাজ আদায় শুরু করেছি, হঠাৎ করেই গুলির শব্দ। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, কোথাও নির্মাণের কাজ হচ্ছে। তখনই দেখলাম মানুষ চিৎকার করে দৌড়াচ্ছে।’

হিরমরটন হাইস্কুলের এই ছাত্র জানায়, তার চাচাসহ পরিচিত ছয়জন নিহত হয়েছেন। কীভাবে সেখান থেকে বের হতে পেরেছ? এমন প্রশ্নে সে বলে, ‘আমি কেবল দৌড়েছি, যত জোরে সম্ভব। কোথাও তাকাইনি। হ্যাগলি পার্কের বেড়া পার হয়ে তবেই থেমেছি।’

আজ স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে মসজিদে নামাজ শুরুর ১০ মিনিটের মধ্যে একজন বন্দুকধারী সিজদায় থাকা মুসল্লিদের ওপর গুলি ছোড়ে। হামলাকারীর হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছিল। হামলা চালিয়ে বন্দুকধারী জানালার কাচ ভেঙে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৯ জন নিহত হয়েছে বলে নিউজিল্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়। গুরুতর আহত হয়েছেন ২০ জন।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Recent Comments

    © All rights reserved © 2023
    Design & Developed BY M Host BD