ফেঁসে যাচ্ছে গিয়াস

85

ডেস্ক নিউজঃ নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে যেন ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ বেরিয়ে আসছে। ২৫ এপ্রিল ইফতারের পর নয়াপল্টন এলাকায় তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে এক যুবককে আটকের পর পথচারীরা বেদম মারধর করে। স্থানীয় একটি মসজিদের খাদেম জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করেন। কলের সূত্র ধরেই পল্টন থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে অচেতন ও রক্তাক্ত অবস্থায় সেই যুবককে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠান। জ্ঞান ফেরার পর জানা যায়, তার নাম মো. জুয়েল। এরপর মাহমুদের ওপর হামলার ঘটনায় তার স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় জুয়েলকে হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। আজ শনিবার তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এদিকে, আহত মাহমুদ ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ ছাড়া হামলায় জড়িত সন্দেহে সাগর সিদ্দিকী নামের আরেক যুবককে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেওয়া হয়। তিনি জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি; ফতুল্লা থানা শ্রমিক দলের সহসভাপতি তুষার আহমেদের ছেলে। আদালতে আসামির জবানবন্দি ও পুলিশের তদন্তে হামলার নেপথ্য কারণ উঠে এসেছে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপির কাউন্সিল পণ্ড হওয়া নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ ও আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের হিসাব-নিকাশ এতে মূল ভূমিকা রাখে। এই হামলার নেপথ্যে ছিলেন বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিনের ছেলে গোলাম মো. কাওসার রিফাত।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুয়েল দীর্ঘদিন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের ফুটপাতে তার ভাইয়ের সঙ্গে কাপড়ের ব্যবসা করেন। পল্টনে বিএনপির পার্টি অফিসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার প্রায় নিয়মিত যাতায়াত। তিনি এলাকায় সক্রিয় বিএনপি কর্মী হিসেবে পরিচিত। এখন পর্যন্ত শাহজাহানপুর, পল্টন ও মতিঝিলে জুয়েলের বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তিনটি মামলার তথ্য রয়েছে। বিএনপি অফিসে যাতায়াতের সূত্র ধরেই জুয়েলের সঙ্গে পূর্বপরিচয় নারায়ণগঞ্জের আরেক বিএনপি কর্মী হৃদয়ের। ঘটনার আগে জুয়েলকে ‘একটি কাজ তুলে’ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে হৃদয় জানান, একজনকে মারতে হবে। এই মিশন সম্পন্ন করতে দু’জনকে ভাড়া করার নির্দেশ দেন হৃদয়। জুয়েল বিশ্বস্ত ভাড়াটে দু’জনকে ম্যানেজ করতে না পেরে হৃদয়কে জানিয়ে দেন, মিশনে তিনি নেতৃত্ব দেবেন। এরপর মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে তিন হাজার টাকা পাঠিয়ে চাকু কেনার পরামর্শ দেন। পরদিন টার্গেট করা ব্যক্তিকে হৃদয়, সাগর ও রিফাত দূর থেকে চিনিয়ে দেওয়ার পর হামলার ছক চূড়ান্ত হয়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার দিন পল্টনের দারুস সালাম ভবনের অষ্টম তলার নিজ ব্যবসায়িক অফিসে একটি ইফতার পার্টিতে অংশ নেন বিএনপি নেতা মামুন মাহমুদ। ইফতার পর্ব শেষ করে হেঁটে নিজের একান্ত সহকারী মো. মহসিনকে নিয়ে বায়তুল মোকাররম এলাকায় পার্ক করা গাড়ির উদ্দেশে যাচ্ছিলেন মামুন। ছক মাফিক ওই সময় মামুনকে ছুরিকাঘাত করে পালানোর চেষ্টা করেন জুয়েল। তবে জনতা তাকে দৌড়ে ধরে ফেলেন।

ফলো করুন-
ভিডিও দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন সমকাল ইউটিউব
কেন মামুনের ওপর হামলার ছক করা হলো- এর কারণ তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে একটি বড় অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন। আরেক অংশের নেতৃত্বে আছেন অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। এলাকায় তার ইমেজ অন্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ভালো। মাহমুদ ও তার স্ত্রী সোনারগাঁ এ কে ফজলুল উইমেন্স কলেজের অধ্যাপক। সর্বশেষ ১৫ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। তবে সম্মেলন শুরুর আগেই সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন ও বিএনপি নেতা মাহমুদের অনুসারীদের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়। গিয়াসের অনুসারী হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা হামলা চালালে কাউন্সিল পণ্ড হয়ে যায়। ওই কাউন্সিলে গিয়াসের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে সভাপতি প্রার্থী ছিলেন ইকবাল ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন জি এম সাদরিল। গিয়াসের ছেলে সাদরিল নাসিকের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। মামুন মাহমুদের ওপর হামলার মিশনে সাদরিলের ভাই রিফাতের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। রিফাত তার বাবার ব্যবসা দেখভাল করেন। ঘটনার দিন পল্টন এলাকায় অবস্থান করে হামলার দিকনির্দেশনা দেন রিফাত। ওই হামলার পর থেকে তিনি পলাতক। এরই মধ্যে তাকে ধরতে একাধিক জায়গায় অভিযানও চালিয়েছে পুলিশ। গিয়াসের ছেলে ছাড়াও ১০-১২ জনের একটি টিম ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে ‘ব্যাকআপ’ পার্টি হিসেবে পল্টনে অবস্থান করছিল বলে প্রযুক্তিগত তদন্তে জানা গেছে।

তদন্তে উঠে আসে, গিয়াসের ছেলে ছাড়াও তার অনুসারীদের বিশ্বাস ছিল, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে মাহমুদের তুলনায় ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছেন গিয়াস। ২০১৮ সালেও নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) থেকে দলীয় মনোনয়ন পান মাহমুদ। এ ছাড়া জেলা বিএনপিতে তার বর্তমান অবস্থান সুসংহত। আগামীতে জেলা কমিটিতে আরও বড় পদপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি। মাহমুদকে এখনই থামানো না গেলে সিদ্ধিরগঞ্জের রাজনীতিতে আরও দুর্বল হওয়ার শঙ্কা গিয়াসের।

মাহমুদের একান্ত সহকারী মো. মহসিন সমকালকে বলেন, হামলার পেছনে রাঘববোয়ালদের খুঁজে বের করে দ্রুত আইনের আওতায় নেওয়া হোক। এখন নানা পর্যায় থেকে জানতে পারছি, গিয়াসের ছেলে রিফাত মূল ভূমিকায় ছিল। সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিনের একাধিক মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করে তাকে পাওয়া যায়নি।

পল্টন থানার ওসি সালাউদ্দিন মিয়া সমকালকে বলেন, হামলার ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি। দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের খোঁজা হচ্ছে। সূত্র-সমকাল

নিউজটি শেয়ার করুন...